• বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোটে জনগণ কি পাবেন

জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোটে জনগণ কি পাবেন

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

২৫ নভেম্বর, ইউনুস সরকার জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্য একটি গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে। গণভোটে ৪টি বিষয়কে একটি প্রশ্ন আকারে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে জনগণকে হ্যাঁ অথবা না ভোট দিতে হবে।

প্রথমত জুলাই সনদে ৮৪টি বিষয় উল্লেখ আছে। তার মধ্যে বহু বিষয়ে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত রয়েছে। ৩০টি বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। কিন্তু মতামত দিতে হবে ৮৪টি বিষয়েই– একটি মাত্র উত্তরে। এটা যে একটা মস্করা তা বোঝার জন্য সংবিধান-বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই।  

জুলাই সনদ গ্রহণ করার জন্য  দীর্ঘ ৯ মাস আলোচনা করেছে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি ও পেটিবুর্জোয়া পার্টিগুলোর নেতারা। শ্রমিক-কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রমজীবী শ্রেণি-পেশার জনগণের কোনো প্রতিনিধিকে এ সনদের আলোচনায় ডাকা হয়নি। জুলাই সনদে শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসীসহ নিপীড়িত জনগণের কোনো সমস্যা/ইস্যু স্থান পায়নি। জনগণের শত্রু মার্কিন-রাশিয়া-চীন সহ সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ এবং আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই। আছে শাসকশ্রেণির কোনো একক গোষ্ঠী যেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ক্ষমতাবহির্ভূতদের ক্ষমতার হালুয়া-রুটি থেকে বঞ্চিত করতে না পারে তারই কিছু বন্দোবস্ত।  

তথাকথিত জুলাই সনদ হলো বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির “তৃতীয় শক্তি”র রাজনীতি ও আপস-ফর্মূলা, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির হাসিনা-আওয়ামী বিরোধী অংশগুলোর আপাত ঐক্য ও কোন্দলের দলিল। এতে জনগণের কোনো মৌলিক স্বার্থ নেই। 

জুলাই সনদের উপর গণভোট এদেশের বুর্জোয়া তৃতীয় শক্তির এক অদ্ভুত আবিষ্কার। প্রথমত, একে বলা হচ্ছে জুলাই সনদ, এবং বলা হচ্ছে যে, তাদের পছন্দমতো রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ইউনূস সরকারের যে আলোচনা হয়েছিল তার ঐকমত্য। কিন্তু এটা একটা মিথ্যাচার। এমনকি বুর্জোয়া দলগুলোও, বিশেষত তাদের প্রধান দল বিএনপি প্রস্তাবিত সনদে অনেক আপত্তি লিপিবদ্ধ করেছিল। পরে সেই আপত্তিগুলোকে উহ্য রেখে সরকারের কাছে আলী রিয়াজের নেতৃত্বে যে সুপারিশ করা হয় তাতে এইসব আপত্তিকে বেমালুম গায়েব করে দেয়া হয়েছিল। কার্যত শুধু জামাত ও এনসিপি’র সমর্থিত প্রস্তাবগুলোকে সুপারিশ করা হয়। 

এখন গণভোট হবে এই সুপারিশের উপরই; তথাকথিত ঐকমত্য কমিশনে তাদের মধ্যে আনীত ঐক্যগুলোর উপর নয়। সুতরাং এটা তৃতীয় শক্তি ও তাদের সমর্থিত জামাত-এনসিপি’র একটা জালিয়াতি। এনসিপি এতে স্বাক্ষর না করার কারণ এটা নয় যে তারা এ জালিয়াতিকে সমর্থন করে না। বরং তারা এক্ষেত্রে আরো সরেস। তাদের দাবি এই জালিয়াতির সুপারিশকে এখনি আইন করতে হবে। যদিও তাদেরই মেনে নেয়া সংবিধানের সম্পূর্ণ বিরোধী এই দাবি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুতর জালিয়াতি হলো, গণভোটটি হবে চারটি প্রশ্নের উপর, কিন্তু উত্তর হবে একটি– হ্যাঁ, বা না। উপরন্তু এই চারটি প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে আরো অন্তত ৩০টি প্রশ্ন যার কিছু বিষয়ের সাথে কেউ একমত, কিছু বিষয়ের সাথে দ্বিমত হতে পারে। এ অবস্থায় সাধারণ জনগণ দূরের কথা, শিক্ষিত বহু মানুষের পক্ষেও এক কথায় এর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়া সম্ভব নয়। এই অসম্ভব বিষয়টি জনগণের ঘাড়ে কেন তারা চাপিয়ে দিচ্ছে? দিচ্ছে শুধু একটি কারণে। তারা যেরকম করে তথাকথিত সংবিধান সংস্কার চায় তা যেন সবার উপর চাপিয়ে দেয়া যায়। 

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, যারা এ ব্যাপারে একমত নয়, সেই বুর্জোয়া পার্টিগুলো, বিশেষত বিএনপি, বা বামপন্থি জোট, বা জাতীয় পার্টি– কেউই একে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তখন জামাত-এনসিপি বিএনপি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে সংস্কার না করার অভিযোগ নিয়ে। এটা যদি গণতন্ত্র ও ইনসাফ হয়, একে যদি বলা হয় ঐকমত্য, এমনকি বুর্জোয়াদের নিজেদের ভেতরেও, তাহলে প্রতারণা বলবেন কাকে? আর শ্রমিক কৃষকসহ সাধারণ জনগণের এ বিষয়ে কীই-বা প্রয়োজন রয়েছে? ফলে গণভোটটি কার্যত একটি ব্যর্থতা ও প্রহসনে পরিণত হবে। উপরন্তু গণভোটে শতকরা কত ভাগ ভোট পড়লে তাকে জনগণের সমর্থন বলা হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। অতীতের কয়েকটি গণভোটে ১০০%-এর বেশি ভোটও পড়েছিল কোনো কোনো কেন্দ্রে, আবার ’৯১ সালে ৩৫% ভোটও পড়েছিল। এবারের ভোটটা যদি সহিসালামতে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি করেও ফেলতে পারে, তাহলে হয়তো সংসদ নির্বাচনের ভোটের চেয়ে বহু কম ভোট হতে পারে সনদের উপর গণভোটে। তখন শাসকশ্রেণি কী করবে? জনগণ এ সনদ চায়না, সেরকম সিদ্ধান্ত কি নেবে তারা? 

এগুলো হলো স্রেফ প্রতারণা, ব্যর্থতা ও সংকট। শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির এ সংকট বারে বারে আসছে। আগামীতেও আসবে।

জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোটে জনগণ কি পাবেন

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

২৫ নভেম্বর, ইউনুস সরকার জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্য একটি গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে। গণভোটে ৪টি বিষয়কে একটি প্রশ্ন আকারে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে জনগণকে হ্যাঁ অথবা না ভোট দিতে হবে।

প্রথমত জুলাই সনদে ৮৪টি বিষয় উল্লেখ আছে। তার মধ্যে বহু বিষয়ে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত রয়েছে। ৩০টি বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। কিন্তু মতামত দিতে হবে ৮৪টি বিষয়েই– একটি মাত্র উত্তরে। এটা যে একটা মস্করা তা বোঝার জন্য সংবিধান-বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই।  

জুলাই সনদ গ্রহণ করার জন্য  দীর্ঘ ৯ মাস আলোচনা করেছে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি ও পেটিবুর্জোয়া পার্টিগুলোর নেতারা। শ্রমিক-কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রমজীবী শ্রেণি-পেশার জনগণের কোনো প্রতিনিধিকে এ সনদের আলোচনায় ডাকা হয়নি। জুলাই সনদে শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসীসহ নিপীড়িত জনগণের কোনো সমস্যা/ইস্যু স্থান পায়নি। জনগণের শত্রু মার্কিন-রাশিয়া-চীন সহ সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ এবং আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই। আছে শাসকশ্রেণির কোনো একক গোষ্ঠী যেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ক্ষমতাবহির্ভূতদের ক্ষমতার হালুয়া-রুটি থেকে বঞ্চিত করতে না পারে তারই কিছু বন্দোবস্ত।  

তথাকথিত জুলাই সনদ হলো বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির “তৃতীয় শক্তি”র রাজনীতি ও আপস-ফর্মূলা, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির হাসিনা-আওয়ামী বিরোধী অংশগুলোর আপাত ঐক্য ও কোন্দলের দলিল। এতে জনগণের কোনো মৌলিক স্বার্থ নেই। 

জুলাই সনদের উপর গণভোট এদেশের বুর্জোয়া তৃতীয় শক্তির এক অদ্ভুত আবিষ্কার। প্রথমত, একে বলা হচ্ছে জুলাই সনদ, এবং বলা হচ্ছে যে, তাদের পছন্দমতো রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ইউনূস সরকারের যে আলোচনা হয়েছিল তার ঐকমত্য। কিন্তু এটা একটা মিথ্যাচার। এমনকি বুর্জোয়া দলগুলোও, বিশেষত তাদের প্রধান দল বিএনপি প্রস্তাবিত সনদে অনেক আপত্তি লিপিবদ্ধ করেছিল। পরে সেই আপত্তিগুলোকে উহ্য রেখে সরকারের কাছে আলী রিয়াজের নেতৃত্বে যে সুপারিশ করা হয় তাতে এইসব আপত্তিকে বেমালুম গায়েব করে দেয়া হয়েছিল। কার্যত শুধু জামাত ও এনসিপি’র সমর্থিত প্রস্তাবগুলোকে সুপারিশ করা হয়। 

এখন গণভোট হবে এই সুপারিশের উপরই; তথাকথিত ঐকমত্য কমিশনে তাদের মধ্যে আনীত ঐক্যগুলোর উপর নয়। সুতরাং এটা তৃতীয় শক্তি ও তাদের সমর্থিত জামাত-এনসিপি’র একটা জালিয়াতি। এনসিপি এতে স্বাক্ষর না করার কারণ এটা নয় যে তারা এ জালিয়াতিকে সমর্থন করে না। বরং তারা এক্ষেত্রে আরো সরেস। তাদের দাবি এই জালিয়াতির সুপারিশকে এখনি আইন করতে হবে। যদিও তাদেরই মেনে নেয়া সংবিধানের সম্পূর্ণ বিরোধী এই দাবি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুতর জালিয়াতি হলো, গণভোটটি হবে চারটি প্রশ্নের উপর, কিন্তু উত্তর হবে একটি– হ্যাঁ, বা না। উপরন্তু এই চারটি প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে আরো অন্তত ৩০টি প্রশ্ন যার কিছু বিষয়ের সাথে কেউ একমত, কিছু বিষয়ের সাথে দ্বিমত হতে পারে। এ অবস্থায় সাধারণ জনগণ দূরের কথা, শিক্ষিত বহু মানুষের পক্ষেও এক কথায় এর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়া সম্ভব নয়। এই অসম্ভব বিষয়টি জনগণের ঘাড়ে কেন তারা চাপিয়ে দিচ্ছে? দিচ্ছে শুধু একটি কারণে। তারা যেরকম করে তথাকথিত সংবিধান সংস্কার চায় তা যেন সবার উপর চাপিয়ে দেয়া যায়। 

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, যারা এ ব্যাপারে একমত নয়, সেই বুর্জোয়া পার্টিগুলো, বিশেষত বিএনপি, বা বামপন্থি জোট, বা জাতীয় পার্টি– কেউই একে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তখন জামাত-এনসিপি বিএনপি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে সংস্কার না করার অভিযোগ নিয়ে। এটা যদি গণতন্ত্র ও ইনসাফ হয়, একে যদি বলা হয় ঐকমত্য, এমনকি বুর্জোয়াদের নিজেদের ভেতরেও, তাহলে প্রতারণা বলবেন কাকে? আর শ্রমিক কৃষকসহ সাধারণ জনগণের এ বিষয়ে কীই-বা প্রয়োজন রয়েছে? ফলে গণভোটটি কার্যত একটি ব্যর্থতা ও প্রহসনে পরিণত হবে। উপরন্তু গণভোটে শতকরা কত ভাগ ভোট পড়লে তাকে জনগণের সমর্থন বলা হবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। অতীতের কয়েকটি গণভোটে ১০০%-এর বেশি ভোটও পড়েছিল কোনো কোনো কেন্দ্রে, আবার ’৯১ সালে ৩৫% ভোটও পড়েছিল। এবারের ভোটটা যদি সহিসালামতে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি করেও ফেলতে পারে, তাহলে হয়তো সংসদ নির্বাচনের ভোটের চেয়ে বহু কম ভোট হতে পারে সনদের উপর গণভোটে। তখন শাসকশ্রেণি কী করবে? জনগণ এ সনদ চায়না, সেরকম সিদ্ধান্ত কি নেবে তারা? 

এগুলো হলো স্রেফ প্রতারণা, ব্যর্থতা ও সংকট। শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির এ সংকট বারে বারে আসছে। আগামীতেও আসবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র